বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভুল পরিকল্পনা

পাঁচ বছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি বেড়েছে ৫৯৩%, জ্বালানিতে ৩১১ শতাংশ

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সক্ষমতা বাড়াতে দেশী-বিদেশী বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। এ দুই খাতে ব্যাপকভাবে অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও ভর্তুকি কমানো যায়নি।

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সক্ষমতা বাড়াতে দেশী-বিদেশী বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। এ দুই খাতে ব্যাপকভাবে অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও ভর্তুকি কমানো যায়নি। বিগত পাঁচ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ২ লাখ ৬ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুতে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা এবং ৬৮ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে গ্যাস ও জ্বালানির অন্যান্য খাতে। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর সময়কালে এ পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। অর্থবছর ধরে ভর্তুকির পরিমাণ বিবেচনায় নিলে দেখা যায় এ পাঁচ বছরের ব্যবধানে বিদ্যুতে ভর্তুকি বেড়েছে ৫৯৩ শতাংশ এবং জ্বালানি খাতে ৩১০ শতাংশ।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ভুল মহাপরিকল্পনায় একপেশেভাবে এ দুই খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন করেছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। এ সময় প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বিদ্যুৎ খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে। অন্যদিকে অবহেলিত ছিল জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা। যে কারণে ব্যয়বহুল জ্বালানি আমদানি করে তা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি হিসেবে দিতে হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যুতে বিপিডিবিকে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে ৮ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ভর্তুকি ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দেয়া হয় ২৩ হাজার কোটি টাকা, যা তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ১১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভর্তুকি দেয়া হয় ৩৩ হাজার কোটি টাকা। আর ২০২৪-২৫ সংশোধিত অর্থবছরে বিপিডিবির ভর্তুকি ছিল ৬২ হাজার কোটি টাকা। বিগত পাঁচ অর্থবছরের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিদ্যুতের ভর্তুকি পাঁচ অর্থবছরের ব্যবধানে ৫৩ হাজার ৫৫ কোটি টাকা বেড়েছে। এ ভর্তুকি বৃদ্ধি বিবেচনা করলে এ সময়কালে বিদ্যুতে ভর্তুকি ৫৯৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০২০-২১ অর্থবছরের বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ছিল (ইনস্টল ক্যাপাসিটি) ২২ হাজার ৩১ মেগাওয়াট। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যুতে সক্ষমতা দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৯৮ মেগাওয়াট। ২০১০ সালে পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান বা বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতে প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে চাহিদা বাড়বে। কিন্তু দেখা গেছে, এ সময়কালে বিদ্যুতের সক্ষমতা ব্যাপকহারে বাড়ানো হলেও বিদ্যুতের চাহিদা ১০ শতাংশ হারে বাড়েনি। বরং উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক বসিয়ে রেখে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।

মূলত সরকার বেশি দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে কম মূল্যে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করায় ভর্তুকি দিতে হয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বছরের পর বছর সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নিচ্ছে কিন্তু বিদ্যুৎ খাতে এ ভর্তুকি আর কমাতে পারেনি। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে গিয়ে বেসরকারি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয় ব্যাপক হারে। আওয়ামী সরকারের বিগত ১৪ বছরে ৮২টি বেসরকারি ও ৩২টি রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেয়া হয়েছে। ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত এ পরিমাণ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেয়া হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এ পেমেন্ট প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বেড়েছে মূলত সরকারের বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা ঠিকমতো কাজ না করায়। বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় ও চাহিদার বিষয়টি উপেক্ষিত রেখে সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে বছরের পর বছর। ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। এমনকি সরকারি সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রাখার মতো গুরুতর অভিযোগও ছিল আওয়ামী শাসনামলে।

বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি কমানোর পরিকল্পনার বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে আনতে আমরা বিভিন্ন চুক্তি রিভিউ করছি। কোথায় কোথায় ব্যয় বেশি হচ্ছে, কোন জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সাশ্রয়ী হবে, সেই বিষয়গুলোতে নজর দেয়া হচ্ছে। বিগত সময়ে গ্যাস-বিদ্যুতে বিপুল পরিমাণ বকেয়া ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে এসব বকেয়া পরিশোধ করেছে। বিগত সময়ের বকেয়া চলতি অর্থবছরে গ্যাস-বিদ্যুৎ খাতে যুক্ত হয়ে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়েছে। তবে প্রস্তাবিত অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি কমানো হয়েছে। ৩৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রাখা হয়েছে। সামনের দিনে এটা আরো কমে যাবে। এখন কোনো বকেয়া নেই। বকেয়ার বিলম্ব মাশুল নেই। ফলে পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’

বিদ্যুতের মতো দেশের জ্বালানি খাতেও বিগত অর্থবছরগুলোতে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়েছে। বিশেষ করে গ্যাস খাতে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে এ খাতে সরকারকে বড় অংকের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে গ্যাস খাতে সরকারের ভর্তুকি ২১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের তুলনায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গ্যাস খাতে ভর্তুকি ছিল ৮ হাজার ২২০ কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের গ্যাস খাতে ভর্তুকি ছিল ৫ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ভর্তুকি ছিল ১১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ভর্তুকি দেয়া হয় ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এ ভর্তুকি বৃদ্ধি বিবেচনা করলে উল্লেখ্য পাঁচ অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি ৫৯৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

পেট্রোবাংলাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাস খাতের মূল ভর্তুকি যায় এলএনজিতে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনে কম মূল্যে সরবরাহ করতে গিয়ে এখানে মোটা অংকের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে। দেশের জাতীয় গ্রিডে এলএনজি আমদানির পরিমাণ গড়ে ২০ শতাংশ। এ এলএনজি আমদানিতে সরকারকে বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশেষত বেশি দামে এলএনজি আমদানি করে কম মূল্যে বিক্রি করার কারণে পেট্রোবাংলার এ ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা ভর্তুকি দিয়ে মেটাতে হয়।

পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি ইউনিট গ্যাস সরবরাহে সংস্থাটির খরচ হচ্ছে ২৯ টাকা ৩৯ পয়সা। আর গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রি করা হচ্ছে ২২ টাকা ৮৭ পয়সা। ঘাটতির অর্থ প্রতি বছর সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি হিসেবে নিচ্ছে পেট্রোবাংলা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস খাতে খরচ নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বরং অযাচিত ব্যয় রেখেই এ খাতের ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করার কোনো চেষ্টা নেই। বরং বছরের পর বছর বিগত সরকার গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিয়েছে। এটা এ খাতের নীতি-আদর্শ হতে পারে না। পরিবর্তিত সরকার গ্যাস-বিদ্যুতের লুণ্ঠনমূলক ব্যয়কে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। যে কারণে এ খাতে ভর্তুকি বেড়েছে।’ এভাবে চলতে থাকলে সামনে ভর্তুকি আরো বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

দেশে গ্যাস খাতে ভর্তুকি বেড়ে যাওয়ার কারণ মূলত দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের অনুসন্ধান না করা। ২০১৮ সালে দেশে এলএনজি আমদানি শুরু হলে স্থানীয় গ্যাস খাতের উন্নয়নে তেমন কোনো বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়নি। প্রতি বছর বাজেটে ১ থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়। সীমিত এ অর্থ বরাদ্দ নিয়ে পেট্রোবাংলা বড় আকারে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাতে পারেনি। এমনকি বড় বড় কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েও পিছিয়ে আসতে হয়েছে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাস খাতে অনুসন্ধান ও খননে বিভিন্ন জরিপ ও মহাপরিকল্পনার পরামর্শ ছিল। কিন্তু অজানা কারণে সেই বিষয়গুলো এড়িয়ে আমদানিনির্ভরতাকে সামনে আনা হয়েছে। সীমিত এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে পেট্রোবাংলা আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে। এখন কিছুটা গতি এসেছে। তবে বৃহৎ আকারে কার্যক্রম চালাতে অর্থ প্রয়োজন।

আরও